রাত গভীর। চারপাশ নিস্তব্ধ। সবাই যখন গভীর ঘুমে, তখন হঠাৎ কেউ বিছানা ছেড়ে নেমে গেল, দরজা খুলল, উঠোন পার হয়ে গাছে উঠে বসে রইল— শুনতে অনেকটা ভৌতিক গল্পের মতো লাগলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর ব্যাখ্যা আছে। ঘুমের ভেতর হাঁটা বা অস্বাভাবিক আচরণ, যাকে বলা হয় স্লিপওয়াকিং বা নিদ্রাভ্রম; এটা মানুষের আচরণকে কখনও কখনও বিস্ময়কর পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে।
স্লিপওয়াকিং হলো ঘুমের একটি ব্যাধি, যেখানে ব্যক্তি পুরোপুরি জেগে না উঠেই কিছু কাজ করতে পারেন। সাধারণত গভীর ঘুমের একটি পর্যায়ে এটি ঘটে। চিকিৎসকদের মতে, এ অবস্থায় মস্তিষ্কের একটি অংশ ঘুমে থাকলেও আরেকটি অংশ আংশিক সক্রিয় হয়ে যায়। ফলে ব্যক্তি চলাফেরা করতে পারলেও পুরোপুরি সচেতন থাকেন না।
ঘুমের মধ্যে কি সত্যিই গাছে ওঠা সম্ভব?
ঘুমের মধ্যে শুধু গাছে ওঠা নয়, আরও অনেক কাজই করতে পারে মানুষ। যেমন— সিঁড়ি বেয়ে ওঠা, রান্নাঘরে যাওয়া, দরজা খুলে বাইরে বের হওয়া, এমনকি গাড়ি চালানোর ঘটনাও ঘটে। তবে, এমন ঘটনা তুলনামূলক কম দেখা যায়। ঘুমের ভেতর গাছে ওঠার ঘটনা সাধারণত ঘটে থাকে, যদি ব্যক্তি ছোটবেলা থেকে গাছে ওঠায় অভ্যস্ত হন বা পরিবেশটি তার পরিচিত হয়। কারণ স্লিপওয়াকিংয়ের সময় শরীর অনেকটা অভ্যাসনির্ভরভাবে কাজ করে থাকে। তবে এখানে বড় ঝুঁকি হলো— ব্যক্তি নিজের নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন থাকেন না। ফলে পড়ে যাওয়া, আঘাত পাওয়া বা দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়ে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র মায়োক্লিনিকের তথ্য মতে, যারা ঘুমের মধ্যে হাঁটেন- তাদের কেউ কেউ এই অবস্থাতেই পোশাক পরা, কথা বলা বা খাওয়ার মতো দৈনন্দিন কাজকর্ম করেন।
সম্প্রতি বাংলাদেশ স্লিপ সার্জনস অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব ও নাক কান গলা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মনিলাল আইচ লিটু এক গণমাধ্যমে বলেন, ‘ঘুমের ঘোরে যারা এমন কাজ করেন, এটা তাদের মনে থাকে না। পরদিন তারা কিছুই বলতে পারবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘অনেক জায়গায় দেখবেন ট্যুরিস্টরা গাছের ওপরে নির্মিত কাঠের ঘরে ঘুমাতে পছন্দ করে। কারণ এটি তাদের শক্তি, মানসিক স্থিরতা দেয় এবং তারা এক ধরনের সুখ অনুভব করেন। পাহাড়ি ও পশ্চিমা ট্যুরিস্টদের মধ্যে এই প্রবণতা দেখা যায় বেশি। কিছু অঞ্চলে আদিবাসীরা গাছের ওপরে বিশেষ কায়দায় ঘুমায়।’
কেন এমন হয়?
অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, মানসিক চাপ বা ট্রমার কারণে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটতে পারে। এতে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিশ্রাম ব্যাহত হয়, যা স্লিপওয়াকিংয়ের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে জ্বরের সময় স্লিপওয়াকিং দেখা যায়। এ ছাড়া পরিবারে কারও স্লিপওয়াকিংয়ের ইতিহাস থাকলে, অন্য সদস্যদের মধ্যেও এটি দেখা দিতে পারে।
শিশুদের মধ্যে স্লিপওয়াকিং তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকেরই এই সমস্যা কমে যায়। তবে প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এটি দেখা দিলে কিংবা শিশুদের যদি কৈশোর পর্যন্ত এ সমস্যা চলতে থাকে, সেক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
করণীয় কী?
ঘুমের পরিবেশ নিরাপদ রাখুন। দরজা-জানালা ও বিপজ্জনক জায়গা সুরক্ষিত রাখুন। পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন। মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা করুন। সমস্যা ঘন ঘন হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। ঘুমের মধ্যে গাছে ওঠার মতো ঘটনা অস্বাভাবিক ও বিরল হলেও একেবারে কল্পকাহিনি নয়। মানব মস্তিষ্ক ঘুমের সময়ও কতটা জটিলভাবে কাজ করতে পারে, স্লিপওয়াকিং তারই একটি বিস্ময়কর উদাহরণ। তাই এমন ঘটনা দেখলে ভৌতিক ব্যাখ্যার চেয়ে বৈজ্ঞানিক কারণ খোঁজাই বেশি যুক্তিযুক্ত।
Leave a Reply